আত তাক্বউইমুশ শামসী

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র সূরা বনী ইসরাঈল শরীফ উনার ১২নং আয়াত শরীফ উনার মধ্যে চন্দ্র বছরের পাশাপাশি ও সৌর বছরের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাই এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, মুসলমান উনাদের চন্দ্র বছরের পাশাপাশি সৌর সন ব্যবহারেরও প্রয়োজন রয়েছে। মুসলমান উনাদের যে সমস্ত ক্ষেত্রে সৌরসনের প্রয়োজন হয় তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে যেমন-

১. প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযসহ অন্যান্য নামায উনাদের ওয়াক্ত নির্ণয়।
২. সাহরী-ইফতারের সময় নির্ণয়।
৩. সম্মানিত হজ্জ উনার বেশ কিছু রোকন আদায়ের সময় নির্ণয়।

একটি সৌর সন অনুযায়ী সে বিষয়গুলো উল্লেখ থাকলে মুসলমান উনাদের জন্য পালন করা সহজ।

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِ‌يْنَ وَالْمُنَافِقِيْنَ
অর্থ : “তোমরা কাফির ও মুনাফিক্বদের অনুসরণ অনুকরণ করো না।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১ ও ৪৮)

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ عَمرِو بْنِ شُعَيْبِ رَحِمَةُ اللهِ عَلَيْهِ عَنْ اَبِيْهِ عَنْ جَدّهٖ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَتَشَبَّهُوْا بِالْيَهُوْدِ وَلَا بِالنَّصَارٰى
অর্থ : “তাবিয়ী হযরত আমর বিন শুয়াইব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার পিতা হতে তিনি উনার দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আমাদের ভিন্ন অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। কাজেই আপনারা ইয়াহুদী এবং নাছারাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবেন না।” (তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ ৩৯৯ পৃষ্ঠা)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَر رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (আবূ দাঊদ শরীফ, মুসনাদে আহমদ শরীফ)

আর তাই মুসলমানগণ যাতে কাফির-মুশরিক-মুনাফিকদের অনুসরণ হতে বেঁচে থাকতে পারে সে কারণেই এই মুবারক তাক্বউইম রচনা করা হয়েছে।

আরবীতে اَلتَّقْوِيْـمُ ‘আত তাক্বউইম’ অর্থ বর্ষপঞ্জি আর اَلشَّمْسِ ‘আশ শামস’ অর্থ হচ্ছে ‘সূর্য’ আর দুইয়ে মিলে হয়েছে, اَلتَّقْوِيْـمُ اَلشَّمْسِىٌّ “আত তাক্বউইমুশ শামসী”। অর্থাৎ সৌর বর্ষপঞ্জি।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فَاذْكُرُوْنِـىْ اَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوْا لِىْ وَلَا تَكْفُرُوْنِ
অর্থ : “সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫২)

ঈসায়ী ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে খৃস্টানদের তথাকথিত ধর্মযাজক, চরিত্রহীন, কাফির পোপ গ্রেগরী, যার একটি বিবাহ বহির্ভূত সন্তানও ছিল। তাহলে ঈসায়ী ক্যলেন্ডার ব্যবহার করলে কার স্মরণ হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। ফসলী সন, ঈসায়ী সন কোনটাই মুসলমান ব্যবহার করে কাফিরদের স্মরণ করতে পারেনা।

এই তাক্বউইম-এর মাসের নামকরণ করা হয়েছে আরবী পদ্ধতি অনুযায়ী। যেমন, আরবীতে প্রথমকে বলা হয় আউওয়াল, দ্বিতীয়কে বলা হয় ছানী। এভাবে ১ম মাস থেকে ১২তম মাস পর্যন্ত নামকরণ করা হয়েছে-

ক্রম নামকরণ ক্রম নামকরণ
আউওয়াল (اَوَّلٌ) সাবি’ (سَابِعٌ)
ছানী (ثَانِىْ) ছামিন (ثَامِنٌ)
ছালিছ (ثَالِثٌ) তাসি’ (تَاسِعٌ)
রবি’ (رَابِعٌ) ১০ ‘আশির (عَاشِرٌ)
খমিস (خَامِسِ) ১১ হাদী ‘আশার (حَادِىْ عَشَرَ)
সাদিস (سَادِسٌ) ১২ ছানী ‘আশার (ثَانِىْ عَشَرَ)

আরবী মাসের প্রতিটি দিনের নামানুসারেই নামকরণ হয়েছে। যথা:

বার (উচ্চারণ) বার (আরবী) বার (প্রচলিত নাম)
ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম يَوْمُ الْاِثْنَيْنِ الْعَظِيْمِ সোমবার
ইয়াওমুছ ছুলাছা يَوْمُ الثُّلَاثَاءِ মঙ্গলবার
ইয়াওমুল আরবিয়া يَوْمُ الْاَرْبِعَاءِ বুধবার
ইয়াওমুল খমীস يَوْمُ الْـخَمِيْسِ বৃহস্পতিবার
ইয়াওমুল জুমু‘আ يَوْمُ الْـجُمُعَةِ জুমু’আ বার
ইয়াওমুস সাবত يَوْمُ السَّبْتِ শনিবার
ইয়াওমুল আহাদ يَوْمُ الْاَحَدِ রোববার

প্রতিটি বিজোড়তম মাস ৩০ দিনে এবং জোড়তম মাসগুলো ৩১ দিনে শুধু ব্যতিক্রম হবে ১২তম মাস। কিন্তু ৪ দ্বারা বিভাজ্য সালগুলোতে ৩১ দিনে হবে। তবে ১২৮ দ্বারা বিভাজ্য সালগুলো ব্যতীত।

মাস দিন মাস দিন
আউওয়াল (اَوَّلٌ) ৩০ সাবি’ (سَابِعٌ) ৩০
ছানী (ثَانِىْ) ৩১ ছামিন (ثَامِنٌ) ৩১
ছালিছ (ثَالثٌ) ৩০ তাসি’ (تَاسِعٌ) ৩০
রবি’ (رَابِعٌ) ৩১ ‘আশির (عَاشِرٌ) ৩১
খমিস (خَامِسِ) ৩০ হাদী ‘আশার (حَادِىْ عَشَرَ) ৩০
সাদিস (سَادِسٌ) ৩১ ছানী ‘আশার (ثَانِىْ عَشَرَ) ৩০

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিতে ফেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনে, অধিবর্ষে ২৯ দিন। বছরের দ্বিতীয় মাসে অতিরিক্ত একদিন যোগ হওয়াতে বাকী ১০ মাসই ১ দিন পিছিয়ে যায়। কিন্তু আত-তাক্বউইমুশ শামসীতে অতিরিক্ত একদিন বছর শেষে যোগ হওয়ায় পরিবর্তন লক্ষণীয় নয় (যা চার বছর পর পর করা হয়)। কেননা নতুন বছর শুরু হয়ে যায়।

শামসী সনের হিসাব : একটি সৌর বছরের সময়কাল হচ্ছে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। ফলে দেখা যায়, নতুন বছর শুরু করলেও পৃথিবীর ঘূর্ণয়ন তখনো বাকী থাকে। প্রতি চার বছর পর পর ঘড়ির সময়ের সাথে এই পার্থক্য প্রায় ১ দিন হয়ে যায়।

শামসী সনে যেভাবে মাসের দিনগুলো সাজানো হয়েছে এর ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণয়ন সাথে বছরে মাত্র ০.২ সেকেন্ডেরও কম পার্থক্য হয়। পক্ষান্তরে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিতে এই পার্থক্য প্রায় ২৭ সেকেন্ড।

ঈসায়ী সনের হিসাব : মহাকাশবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এক সময় মানুষ জানতে পারে যে, এক সৌর বছর সমান ঠিক ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা বা ৩৬৫.২৫ দিন নয়। বরং তার চেয়ে কিছুটা কম। তাছাড়া রোমান ক্যাথলিক চার্চ ৩২৫ ঈসায়ী সনে হিসাব করে ২১ মার্চ দিবারাত্রি সমান হওয়ার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু ১৫৮২ ঈসায়ী সনে এসে সে হিসাব আর মিলছে না। বরং ২১ মার্চের পরিবর্তে ১১ মার্চ দিবারাত্রি সমান হচ্ছে। ফলে ক্যালেন্ডারের নির্ধারিত বসন্তকাল শুরু হওয়ার ১০ দিন আগেই প্রকৃতিতে বসন্তকাল শুরু হয়ে যাচ্ছে। এটা উপলব্ধি করেই ক্যালেন্ডার সংস্কার করা হয়।
তখন হিসাব করে দেখা যায়, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে গড়ে এক বছর সমান ধরা হয়েছে ৩৬৫.২৫ দিন, কিন্তু বাস্তবে এক সৌর বছর সমান হলো ৩৬৫.২৪২২ দিন। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ১১ মিনিট করে প্রকৃতির সাথে ক্যালেন্ডারের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই ৩২৫ ঈসায়ী সনের হিসাবের সাথে ১৫৮২ ঈসায়ী সনের হিসাব মিলছে না। অর্থাৎ এই (১৫৮২ - ৩২৫ = ১২৫৭ বছরে) ১২৫৭ বছরে প্রকৃতির সাথে ক্যালেন্ডারের ব্যবধান হয়ে গেছে (৩৬৫.২৫ - ৩৬৫.২৪২২)ী১২৫৭ দিন অর্থাৎ প্রায় ১০ দিন।
এ কারণে প্রতিবছর ঋতুর আরম্ভকাল একটু একটু করে সরে এসেছে। ফলে খ্রিস্টানদের ইস্টার দিবস গ্রীষ্ম ঋতুতে চলে আসছে, যা তাদের ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। এই ভুল সংশোধনের জন্য ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের ক্যালেন্ডার থেকে ১০ দিন বাদ দেওয়া হয়। এ কারণেই সে বছর ৪ অক্টোবরের পরের দিন ৫ অক্টোবর না ধরে ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। আর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য ৪ দ্বারা বিভাজ্য সালগুলোকে লিপ ইয়ার ধরার পদ্ধতিতেও কিছুটা সংস্কার আনা হয়। হিসাব করে দেখা যায় যে, প্রতি ৪০০ বছরে এই ভুলের কারণে প্রায় ৩ দিনের ব্যবধান হতো। তাই পোপ ঘোষণা করে যে, এখন থেকে ৪ দ্বারা বিভাজ্য সালকে লিপ ইয়ার ধরার পদ্ধতি ঠিক থাকবে কিন্তু এ নিয়ম শতাব্দীর শেষ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে না। শতাব্দীর শেষ বছর সংখ্যাটি ৪ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ার পাশাপাশি ৪০০ দ্বারাও বিভাজ্য হলেই কেবল তাকে লিপ ইয়ার বলা যাবে। আর এ কারণেই বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৭০০, ১৮০০, ১৯০০ এবং ২১০০ এই সালগুলি ৪ দ্বারা বিভাজ্য হলেও লিপ ইয়ার নয়। অপর দিকে ১৬০০, ২০০০ এবং ২৪০০ সালগুলি ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ার কারণে লিপ ইয়ার। ১৫৮২ ঈসায়ী সনে ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরিয়ান কর্তৃক প্রবর্তিত এই নিয়ম এখনো চলছে। আর পোপের কারণে এ ক্যালেন্ডারের নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার রাখা হলেও আমরা একে সাধারণত ইংরেজী ক্যালেন্ডার বলেই অভিহিত করি। তবে বিভিন্ন দেশে এটা ওয়েস্টার্ন ক্যালেন্ডার বা খ্রিস্টিয়ান ক্যালেন্ডার নামেও পরিচিত।

ফসলী সনের হিসাব : সূর্য সিদ্ধান্ত মতে, এক বছর হল ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ দিন। কিন্তু গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এক বছর হল ৩৬৫.২৪২২ দিন। অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ফসলী সনের ক্যালেন্ডার বছরে ০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৮৪ সেকেন্ড বেশি। তার মানে ১৪২০ বছরে দিন বেড়ে গিয়েছে ১৪২০ী০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩.৫০৯৫২ দিন বা ২৪ দিন। এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেল ১লা বৈশাখ ২১ মার্চ না হয়ে কেন এখন ১৪ বা ১৫ এপ্রিল হয়। তার মানে, প্রতি ৬০ বছরে ফসলী সনের ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে একদিন করে বেড়ে চলেছে। ফসলী সনের ক্যালেন্ডার প্রণেতাদের এই ত্রুটি সংশোধনের কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। এমনটা যদি চলতেই থাকে তবে ৯৫০ বছর পরে মে দিবস আর ফসলী নববর্ষ পালিত হবে একই দিনে!
আবার ফসলী সনের দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিন ধরলে হিসাব হয় অন্যরকম। কিন্তু পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড লাগে। এই ঘাটতি দূর করার জন্য গ্রেগরিয়ান সালে প্রতি চার বছর পর পর ফেব্রুয়ারী মাসের সাথে একদিন যোগ করা হয় (শুধু যে শত বছর ৪০০ দিয়ে ভাগ হয় সে বছর যোগ করা হয়না)। শুরুর দিকে ফসলী সনের এই অতিরিক্ত সময়কে গনণায় নেয়নি। পরে এই ঘাটতি দূর করার জন্য বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধায়নে এবং ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পরিচালনায় একটা কমিটি গঠন করা হয় ১৯৬৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী। পরে কমিটির সুপারিশ-এ বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রত্যেক মাসকে ৩১ দিনের এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাসগুলো ৩০ দিনের হিসাবে গনণা করা শুরু হয়। আর প্রতি চার বছর পর পর চৈত্র মাসকে ৩১ দিন ধরা হয়। আর এভাবেই আজকের এই ফসলী সনের প্রচলন হয়।

শামসী সনের হিসাব : একটি সৌর বছরের সময়কাল হচ্ছে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। ফলে দেখা যায় নতুন বছর শুরু করলেও পৃথিবীর ঘূর্ণনের তখনো বাকী থাকে। এক সময় (অনেক বছর পর পর) ঘড়ির সময়ের সাথে এই পার্থক্য অনেক হয়ে যায়। কিন্তু শামসী সনে যেভাবে মাসের দিনগুলো সাজানো হয়েছে এর ফলে এই পার্থক্য বছরে মাত্র ০.২ সেকেন্ডেরও কম।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক বিছালী শান মুবারক প্রকাশের বছর হচ্ছে ১১ হিজরী এবং সে বছরের পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ। উক্ত মুবারক মাস উনার ১ম দিন অর্থাৎ ১লা রবীউল আউওয়াল শরীফ থেকে এই শামসী সনের ০ বছর ১ম মাস ১ম দিন শুরু হয়েছে। তাহলে আপনি যে বছর শামসী সন গণনা করবেন তত বছর পূর্বে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছিলেন। সুবহানাল্লাহ!
তাহলে খুব সহজেই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার স্মরণ হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ্!

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ উনার সময় চন্দ্র মাস গণনা হলেও সেসময় আরবগণ মাস আগ পিছ করতো (যাকে ইসলামী পরিভাষায় নাসী বলে)। আবার হিজরী সন গনণা শুরু হয় উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পর। হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার প্রস্তাবে হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক হিজরত শরীফ বছর থেকে হিজরী সাল গণনা শুরু করেন। যদিও হিজরত শরীফ সংঘটিত হয়েছিল পবিত্র রবীউল আউয়াল শরীফ মাস উনার মধ্যে কিন্তু হিজরী সাল গণনা শুরু হয় মুহররমুল হারাম শরীফ মাস থেকে। যাই হোক মুবারক বিছাল শরীফ বছর নির্দিষ্টভাবে জানা আছে বলে সেখান থেকে শামসী সন শুরু করা হয়েছে।

আমরা জেনেছি হিজরী ১১ সন থেকে শামসী ০ (শূণ্য) সন শুরু। তাহলে পার্থক্য হচ্ছে ১১ বছরের। কিন্তু বর্তমানে হিজরী সন চলছে ১৪৩৮ আর শামসী সন চলছে ১৩৮৪। পার্থক্য হচ্ছে ৫৪ বছর। তা কেন?
আমরা ইতোপূর্বে বলেছি হিজরী সন গণনা হয় চাঁদের আবর্তনের সাথে আর সৌর সন গণনা হয় সূর্যের আবর্তনের সাথে। আর হিজরী সনের সঙ্গে সৌর সনের পার্থক্য প্রতি বছর ১০ থেকে ১১ দিন। সুতরাং শুরু থেকে এই পর্যন্ত এই ৫৪ বছরের পার্থক্য এসে দাঁড়িয়েছে।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عَنْ حَضْرَتْ أَبُو هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعالٰى عَنْهُ عَنِ النَّبِيّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اِذَا اَحَبَّ اللهُ الْعَبْدَ نَادَى جِبْرِيْلَ اِنَّ اللهَ يُـحِبُّ فُلاَنًا فَأَحْبِبْهُ‏.‏ فَيُحِبُّهٗ جِبْرِيلُ، فَيُنَادِيْ جِبْرِيلُ فِيْ أَهْلِ السَّمَاءِ اِنَّ اللهَ يُـحِبُّ فُلاَنًا فَأَحِبُّوْهُ‏.‏ فَيُحِبُّهٗ أَهْلُ السَّمَاءِ، ثُـمَّ يُوْضَعُ لَهُ الْقَبُوْلُ فِي الاَرْضِ‏‏.‏

অর্থ : “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন যে কেউ মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্যশীল বান্দা হন তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাকে মুহব্বত করেন এবং মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম উনাকে ডেকে বলেন, হে হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম! আমি অমুক বান্দাকে মুহব্বত করি, ফলে আপনিও উনাকে মুহব্বত করুন। তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি ঐ ব্যক্তিকে মুহব্বত করতে থাকেন এবং সেই ব্যক্তির নাম আসমানে ঘোষণা করে দেয়া হয়, তখন আসমানবাসীও সেই ব্যক্তিকে মুহব্বত করতে শুরু করেন। একইভাবে ঐ ব্যক্তির নাম যমীনে ঘোষণা করে দেয়া হয় তখন যমীনবাসীও উনাকে মুহব্বত করতে থাকেন। এভাবে সেই ব্যক্তি উনার নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।” (বুখারী শরীফ)

যখন ১৮৮৪ সালে প্রথম প্রাইম মেরিডিয়ান (পৃথিবীর মূল মধ্য রেখা) সম্মেলন হয় তখন ফ্রান্স ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে এবং দীর্ঘ সময় সে তার মেরিডিয়ানকেই প্রাইম মেরিডিয়ান বলে বিবেচনা করে। তাতে কিন্তু ফ্রান্সের সমস্যা হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে এখন স্বীকৃত না হলেও একদিন হবে। আর কাফিররা কি মানলো আর কি মানলো না তাতে কিছু আসে যায় না। একদিন অবশ্যই মানতে বাধ্য থাকবে।
দ্বিতীয়ত ইসলাম উনার বিষয়টি এমন যে, প্রথমে নিজে আমল করতে হয় পরে তা মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে হয়। সুতরাং আমরা যদি সবাই নিজে শামসী সন ব্যবহার শুরু করি তবে তা একদিন ছড়িয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আর যত মানুষকে জানানো হবে ততই এর ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পৃথিবীর সকল কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, নেটওয়ার্কে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার দেয়া আছে। এই নতুন পদ্ধতি কিভাবে পুরনো পদ্ধতিকে অপসারণ করবে? এই বিষয়টি নির্ভর করবে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একতা এবং খিলাফত ব্যবস্থার উপর। এক সময় মুসলমানগণ বিশ্ব শাসন করেছে তখন উনাদের আইন প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরে কাফির বেনিয়া বৃটিশরা তাদের সময়কালে তাদের আইন চাপিয়েছে। এখন সা¤্রাজ্যবাদীদের আইন চাপানো আছে মুসলিম বিশ্বসহ সকল দেশে। কিন্তু এদের এখন ভগ্ন দশা। আবারো ইসলাম জেগে উঠবে আর সম্মানিত ইসলাম অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে এই বিশ্ব। ইনশাআল্লাহ। তখন সহজেই বিশ্বের সর্বত্র আত তাক্বউইমুশ শামসী সনই প্রচলিত হবে। ইনশাআল্লাহ।

গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি কাফিরদের তৈরি ফলে এর অনুসরণের ফলে শুধু কাফিরদের স্মরণ হয়; যা মুসলমান উনাদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম। এ ছাড়াও এর অনুসরণে কল্যাণ নেই বরং অকল্যাণ রয়েছে। কিন্তু “আত-তাক্বউইমুশ শামসী”- এই তাক্বউইম অনুসরণে কাফিরদের অনুসরণ হয় না বরং মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের স্মরণ হয়। ফলে মুসলমান উনারা রহমত, বরকত, সাকীনা লাভ করবে। কাফিররা সব ক্ষেত্রে মুসলমান উনাদের অনুসরণ করবে। কারণ এদের সৃষ্টি করা হয়েছে মুসলমান উনাদের খিদমতের জন্য। এই শামসী তাক্বউইম তৈরির ফলে এর ব্যাপক প্রচার-প্রসার হলে ধীরে ধীরে কাফিররা এর অনুসরণ করবে এবং মুসলমান উনাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য বৃদ্ধি পাবে ইনশাআল্লাহ।
গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির ব্যবহার বন্ধ করলে মুসলমান উনারা কাফিরদের অনুসরণ এবং এর অনুসরণের বদ তাছির থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ!

১) যে কোন একটি সন ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই সেই সনের একটি ক্যালেন্ডার হাতের কাছে থাকা প্রয়োজন। শামসী সনের ক্যালেন্ডার ছাপা হয়েছে সেটি সংগ্রহ করতে পারেন। আর অফিসে বা বাসার কম্পিউটারে শামসী তারিখ কনভার্টার নিয়ে রাখতে পারেন, এতে আজ শামসী কত তারিখ বা একটা নির্দিষ্ট দিন শামসী কত তারিখ ছিল তা সহজেই জেনে নিতে পারবেন।

২) প্রতিদিনের কাজের হিসাবগুলো শামসী তারিখ অনুযায়ী করুন তাতে শামসী তারিখ মনে থাকবে।

৩) খুব সহজ পদ্ধতি হচ্ছে প্রতি মাসে ঈসায়ী তারিখের সঙ্গে ১ দিন বা ২ দিন মাত্র পার্থক্য থাকে। প্রতি মাসের শুরুতেই জেনে নিন পার্থক্য কত দিনের এতে মনে রেখে ব্যবহার করতে সহজ হবে। যেমন এ বছর আউওয়াল মাসের সাথে জুন মাসের পার্থক্য ২ দিন।

৪) তবে শুরুতে মাসের নাম, দিনের নাম, মাস গণনার নিয়ম একটু মুখস্থ করে নিলে সুবিধা হবে।

জোড়ের মাসে বিজোড় হবে
বিজোড় মাসে জোড়।

দ্বাদশ মাস ভিন্ন হয়ে
জোড়ে হবে ভোর।

৪ দ্বারা সাল ভাজ্য হলে
দ্বাদশ মাস বিজোড়।

১২৮ দ্বারা ভাজ্য হলে
আগের মতো জোড়।


ব্যাখ্যা : জোড়ের মাসে বিজোড় হবে যেমন ছানী, রাবি’, সাদিস, ছামিন, আশির (৩১ দিনে)। বিজোড় মাসে জোড়। যেমন আউওয়াল, ছালিছ, খমিস, সাবি’, তাসি’, হাদী ‘আশার (৩০ দিনে)।
দ্বাদশ মাস ভিন্ন হয়ে, জোড়ে হবে ভোর। এখানে দ্বাদশ মাস (ছানী আশার) জোড় হবার কারণে ৩১ দিনে হবার কথা কিন্তু ভিন্ন হবে অর্থাৎ ৩০ দিনে হবে। আর ভোর অর্থ “ছানী আশার” শেষ হয়ে নতুন বছর শুরু হয়।
৪ দ্বারা সাল ভাজ্য হলে, দ্বাদশ মাস বিজোড়। যেমন ১৩৮৪ শামসী সন (৩১ দিনে)। ১২৮ দ্বারা ভাজ্য হলে, আগের মতো জোড়। এখানে আগের মতো জোড় বলতে ৪ দ্বারা বিভাজ্য সাল ৩১ দিনে হলেও ১২৮ দ্বারা বিভাজ্য সাল ৩০ দিনে হবে। যেমন ১৪০৮ শামসী সন (৩০ দিনে)।